যৌতুক দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাইফুর’সের সাবেক শিক্ষক মো. আবদুল কুদ্দুস (২৯), ওরফে ‘আদনান’-কে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২৯ জুলাই) জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ৪ নম্বর ট্রাইব্যুনালে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতের নথি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাদী সুমাইয়া আক্তার সাইফুর’সের মোহাম্মদপুর শাখায় ভর্তি হলে শিক্ষক আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। পরে এ ঘটনায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা (নং-৩(৬)/২৫) দায়ের করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর ৫ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ের শর্তে তিনি জামিনে মুক্ত হন এবং পরবর্তীতে বাদীকে বিয়ে করেন। পরে আপসের ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়।
বর্তমান মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিয়ের পর বাদীর ব্যাংক হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা উত্তোলন করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য ব্যয় করেন অভিযুক্ত। বাদীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এ দাবির সমর্থনে ব্যাংক স্টেটমেন্ট আদালতে দাখিল করা হয়েছে বলেও মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, ইউরোপ, বিশেষ করে লন্ডনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বাদীর কাছে ৪০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। বাদী এতে সম্মতি না দিলে চলতি বছরের (৮ এপ্রিল) রাতে কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া এলাকায় তাঁকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
এ ঘটনায় বাদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১১(গ) ধারায় সি.আর. মামলা নং-৫৯/২০২৬ দায়ের করেন। পরে আদালত মামলাটি এজাহার (এফআইআর) হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন।
শুনানি শেষে বাদীপক্ষের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ইব্রাহীম খলীল বলেন, পূর্বের মামলায় বিয়ের শর্তে জামিন পাওয়ার পরও তাঁর মক্কেলের ওপর যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জামিনের বিরোধিতায় তাঁরা প্রয়োজনীয় আইনি যুক্তি আদালতে উপস্থাপন করেছেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট শেখ শওকত হোসেন বলেন, হাইকোর্ট থেকে পাওয়া ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাঁর মক্কেল স্বেচ্ছায় আদালতে হাজির হয়ে পুনরায় জামিন আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, বাদীর অভিযোগ ও চিকিৎসা প্রতিবেদনের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। এছাড়া ঘটনার দুই দিন পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টিও তাঁরা আদালতে তুলে ধরেছেন।
তাঁর ভাষ্য, নিম্ন আদালতে তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি এবং উচ্চ আদালতে আইনি প্রতিকার চাওয়া হবে।
এদিকে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর গত ১৫ এপ্রিল সাইফুর’স কর্তৃপক্ষ একটি অফিসিয়াল নোটিশে মো. আবদুল কুদ্দুসকে বরখাস্ত এবং প্রতিষ্ঠানের সব শাখা ও প্রাঙ্গণে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ (ব্ল্যাকলিস্টেড) ঘোষণা করে।
পরবর্তীতে গত (২১ জুলাই) সাইফুর’সের ফার্মগেট প্রধান কার্যালয়ে বরখাস্তের বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পর একই দিন সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর শাখায় গিয়ে তাঁকে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল কুদ্দুস দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের কাছে তাঁর তিন হাজার টাকা পাওনা ছিল এবং সেই টাকা নিতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তাঁকে নিয়মিত ক্লাস নিতে দেখেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাইফুর’সের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আবদুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে অতীতেও নারীসংক্রান্ত অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের নজরে এসেছিল। তবে সর্বশেষ অভিযোগ সামনে আসার পর তাঁকে বরখাস্ত এবং প্রতিষ্ঠানের সব শাখা থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।